ডেস্ক রিপোর্টঃ
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের দায়িত্বপালন শেষে সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) জাতির উদ্দেশে দেওয়া বিদায়ী ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে একটি উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা ভবিষ্যতের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তিনি জানান, নতুন নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হচ্ছে।
ভাষণে তিনি স্মরণ করেন ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট, যখন দেশ গভীর রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে নিমজ্জিত ছিল। সেই সময় দেশকে স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। দায়িত্ব গ্রহণের সময় তিনটি মূল অঙ্গীকার ছিল—সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন। তিনি বলেন, এই তিন লক্ষ্য বাস্তবায়নে তার সরকার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা জানান, অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী প্রণয়ন এবং প্রায় ৬০০টি নির্বাহী আদেশ জারি করেছে, যার অধিকাংশই ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও শক্তিশালীকরণে পৃথক সচিবালয় গঠন, বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছ কাঠামো প্রবর্তন এবং গুমকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বিচার প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ রাখতে একাধিক ট্রাইব্যুনাল কাজ করছে এবং বেশ কয়েকটি মামলার রায় ইতোমধ্যে ঘোষণা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার সময় পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত ভঙ্গুর; থানাগুলো ছিল প্রায় পুলিশশূন্য এবং মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট ছিল। ধাপে ধাপে সেই অবস্থা পরিবর্তন করা হয়েছে। পুলিশকে জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের সময় ব্যাংকিং খাত দুর্বল ছিল এবং অর্থপাচারের কারণে অর্থনীতি বিপর্যস্ত অবস্থায় ছিল। রাজস্ব, করনীতি, মুদ্রা ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক খাতে কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে স্থিতিশীলতা ফেরানো হয়েছে। বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি, বাজার তদারকি জোরদার এবং টিসিবির কার্যক্রম সম্প্রসারণের ফলে মূল্যস্ফীতি কমেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও শুল্ক চুক্তির ফলে রেসিপরোকাল ট্যারিফ ৩৭ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে নেমে এসেছে বলে তিনি জানান। জাপান ও চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব জোরদারের কথাও তুলে ধরেন। রোহিঙ্গা সংকট ইস্যুতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে মনোযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে তিনি “জুলাই সনদ”-এর কথা উল্লেখ করেন, যা গণভোটে বিপুল সমর্থন পেয়েছে। তার ভাষায়, এই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন হলে স্বৈরাচার বা ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার পথ চিরতরে বন্ধ হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই সনদের বাস্তবায়ন সম্পন্ন হবে।
বিদায়ের প্রাক্কালে তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান, গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা, বাকস্বাধীনতা ও অধিকার চর্চার যে ধারা শুরু হয়েছে, তা যেন কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়। দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “আমার জন্য দোয়া করবেন। মহান আল্লাহ আমাদের সকলের সহায় হোন। আল্লাহ হাফেজ।”




